May 30, 2026

টেকনাফের পাহাড়ে মানুষ বেচাকেনার আস্তানা

কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম পাহাড় এখন মানবপাচারকারীদের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে পরিণত হয়েছে। সেখানে আটক তরুণ-তরুণীরা প্রতিদিন মৃত্যুভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন— হয় মুক্তিপণ, নয়তো সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার অনিশ্চিত যাত্রা।

গত সোমবার রাতে বিজিবি ও র‌্যাবের যৌথ অভিযানে টেকনাফের পাহাড়ি আস্তানা থেকে ৮৪ জনকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে মুন্সীগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলার তরুণ রয়েছেন।

ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা

কুষ্টিয়ার রেজাউল করিম নামের এক তরুণ জানান, বেড়াতে গিয়ে তিনি পাচারকারীদের হাতে ধরা পড়েন। মাত্র ৫০ হাজার টাকায় তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয় অন্য এক পাচারকারীর কাছে। পরে আবারও অন্যত্র বিক্রি করা হয় ৬০ হাজার টাকায়। তিনি বলেন, “চোখ খুলে দেখি শত শত মানুষ বন্দি। আমাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে মুক্তিপণ দাবি করা হতো।” রেজাউলের তথ্যের ভিত্তিতেই যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে আরও ৮৩ জনকে মুক্ত করে।

মুন্সীগঞ্জের অমিত হাসান বলেন, মালয়েশিয়ায় যেতে অস্বীকৃতি জানালে পরিবারের কাছে লাখ লাখ টাকা দাবি করত পাচারকারীরা। আর রাজি হলে ৪–৫ লাখ টাকা আদায় করে নৌকায় তুলে দেওয়া হতো।

দীর্ঘ অভিযান ও গ্রেপ্তার

র‌্যাব–১৫ কক্সবাজারের অধিনায়ক লে. কর্নেল কামরুল হাসান জানান, টেকনাফের বাহারছড়া কচ্ছপিয়ার পাহাড়ি এলাকায় দালালচক্রের আস্তানায় অভিযান চালানো হয়। প্রথমে চারজন ভুক্তভোগীকে উদ্ধারের পর তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তিনটি আস্তানায় বৃহৎ অভিযান চালিয়ে আরও ৮৪ জনকে মুক্ত করা হয়। এ সময় তিন পাচারকারীকে অস্ত্রসহ আটক করা হয়।

অভিযানে অংশ নেওয়া টেকনাফ–২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন, প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে অভিযান চালাতে হয়। পাচারকারীরা গুলি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল এবং ভুক্তভোগীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। কৌশলে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে সবাইকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের দখল

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফের পাহাড়ে দেশীয় দালাল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক চক্র পর্যন্ত সক্রিয় রয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় আসা তরুণরা প্রতিনিয়ত এই সিন্ডিকেটের ফাঁদে পড়ছে।

শুধু গত এক সপ্তাহেই নদী ও পাহাড়ি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ১৭৭ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১২ মানবপাচারকারীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বাহিনী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *